৫ হাজার বছরের পুরনো হারটি যেভাবে ভারত-পাকিস্তান কে ভাগ করে দিয়ে ছিল ব্রিটিশরা

ছোটবেলায় ইতিহাস বইতে পড়া প্রাচীন সিন্ধু সভ্যতার সেই হারটির কথা হয়তো অনেকেরই মনে আছে। মহেঞ্জোদারো এলাকায় খনন করে প্রায় ৫,০০০ বছরের পুরনো হারটি উদ্ধার করা হয়েছিল প্রায় একশ’ বছর আগে।

প্রাচীন ইতিহাসের নিদর্শন সেই হারের সঙ্গে ভারত-পাকিস্তান দেশভাগের ইতিহাসে আপাতভাবে কোনও সম্পর্ক থাকার কথা নয়।

কারণ ভারত আর পাকিস্তান কোনও সময়েই তো আলাদা ছিল না। কিন্তু যখন দুই দেশের মধ্যে ভূমি ভাগ হল, তখন শুধুই যে দুই দেশের মধ্যে সীমারেখা টানা হল, তা নয় – ঐতিহ্যও যেমন ভাগ হয়ে গেল, তেমনই দ্বিখণ্ডিত হল মিলেমিশে কাটানো সময়কালটাও।

একই ভাবে সেই দ্বন্দ্বের ঢেউ লেগেছিল পৃথিবীর প্রাচীনতম সভ্যতাগুলির অন্যতম – সিন্ধু সভ্যতার এলাকা থেকে খুঁজে পাওয়া সেই হাড় টি নিয়েও।

১৯২০ সালে ভারতবর্ষের স্বাধীনতার অনেক আগে যখন ভারত আর পাকিস্তান একটাই দেশ ছিল, সেই সময়ে সিন্ধু নদ অঞ্চলের মহেঞ্জোদারোতে পাওয়া গিয়েছিল এক প্রাচীন শহরের খোঁজ।

এই প্রাচীন সভ্যতা আবিষ্কারের সঙ্গে সঙ্গেই সেই সময়ে ব্রিটিশদের গোলাম হয়ে থাকা ভারত নিজেদের ঐতিহ্য নিয়ে গর্ব করার মতো আরেকটি বিষয় পেয়ে গিয়েছিল।

ভারতের মানুষ সহজেই বুক বাজিয়ে বলতে পারতেন তাঁদের ইতিহাসও মিশর, ইউনান আর চীনের সভ্যতার মতোই হাজার হাজার বছরের পুরনো।

ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু তাঁর বই ‘ডিসকভারি অব ইন্ডিয়া’তেও মহেঞ্জোদারো নিয়ে লিখেছেন, “মহেঞ্জোদারোর ওই টিলার ওপরে দাঁড়িয়ে অনুভব করেছিলাম যে আমি পাঁচ হাজার বছরেরও বেশী পুরনো এক সভ্যতার উত্তরাধিকারী। সে এমন একটা সভ্যতা, যেটা ক্রমাগত পরিবর্তনশীল।”

একটি তামার পাত্রের মধ্যে থেকে ওই হারটি উদ্ধার করা হয়েছিল। মনে করা হয়ে থাকে ওই ঘরটি কোনও স্বর্ণকারের ঘর ছিল।

সিন্ধু সভ্যতা খুঁজে পাওয়াটা ভারতেই ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আবিষ্কার। আর এই সভ্যতা ছিল ভারত-পাকিস্তানের ঐতিহ্য। কারণ ১৯৪৭ সালের আগে দুটো তো এক দেশই ছিল।

কিন্তু ১৯৪৭ সালের জুন মাসে যখন দেশভাগের কথা ঘোষণা হল, তখন থেকে মানুষ ছোট ছোট জিনিসও ভাগাভাগি নিয়ে লড়তে শুরু করল।

কিন্তু সোনার হার ভাগ করার সময়ে তৈরি হল অচলাবস্থা – ওটাই মহেঞ্জোদারো থেকে পাওয়া একমাত্র অক্ষত নিদর্শন ছিল।

হারের ব্যাপারে যখন ঐকমত্যে পৌঁছানো গেল না, তখন কর্মকর্তারা ঠিক করলেন হারটিকে দুইভাগ করে ফেলা হোক – ঠিক যেভাবে দুটো দেশকে ভাগ করে আলাদা করা হয়েছিল।

এই অসাধারণ প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনটিকে আধা-আধি ভাগ করে দুই দেশ একেকটি ভাগ নিয়ে নিল।

ভারত যে ভাগটা পেয়েছিল, সেটা দিল্লির জাতীয় সংগ্রহশালায় রয়েছে।

ইতিহাসবিদ সুদেষ্ণা গুহর কথায়, “এই হারটি ভাগ করা এক ঐতিহাসিক দুর্ঘটনা। ইতিহাসকে কেটে দু’টুকরো করে ফেলা হল। আফসোস এটাই যে এই ঘটনার জন্য কেউ লজ্জিতও হল না!”

ভারত আর পাকিস্তানের মধ্যে ইতিহাস ভাগ করার সবচেয়ে বড় সাক্ষী থেকে গেছে মহেঞ্জোদারোর এই হারটির দুটো টুকরো।

Please follow and like us:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Facebook
YouTube
error: Content is protected !!