স্যার ফজলে হাসান আবেদ – একখানা শংসাপত্র

দেশ তখন কেবল স্বাধীন হয়েছে, ইন্ডিয়ার রিফুজি ক্যাম্প থেকে ফেরত এসেছি মাত্র তিন – চার সপ্তাহ আগে । জানুয়ারী ১৯৭২ সাল সারাদিন আমি আর তৎকালীন কর্নেল দত্তের ছেলে রাজু সিলেট শহরে সাইকেল চালিয়ে বেড়াতাম । তখন মীরের ময়দান রোডে ছোট্ট একটা ৪ ফুট লম্বা আর ২ ফুট প্রস্থ একটা সাইনবোর্ড দেখেছিলাম, ‘’ বাংলাদেশ রিহ্যাবিলেটসন এসিস্টেন্স কমিটি [ব্র্যাক] ‘’ । সাইন বোর্ড ও নিওন সাইন এর লেখা পড়া এবং ওগুলো মুখস্থ করা আমার সেই ছোট বেলার অভ্যাস। সিলেট শহরের হাই স্কুল গুলো কেবল তখন ক্লাস শুরু করলো ভর্তি হলাম এইডেড স্কুল এ । প্রত্যহ সাইকেল চালিয়ে ক্লাসে যেতাম । রিহ্যাবিলেটসন শব্দটা আমার বেশ পরিচিত ছিল। আমাদের ফুফু অধ্যাপিকা মমতাজ বেগম এম পি নারী পুনর্বাসন মন্ত্রণালয় এর অধীনে নারী রিহ্যাবিলেটসন প্রোগ্রামে জয়েন করার জন্য আমার আম্মা কে রিকুয়েস্ট করেছিলেন । কুমিল্লা অঞ্চলের সব বীরাঙ্গনা মহিলাদের র‍্যিহেবিলেটেসন করার জন্য নতুন একটি উদ্যোগ হাতে নেয় উনি এবং আমার মা কে ঐ টার প্রোগ্রাম ডাইরেক্টর হিসেবে নিতে চাচ্ছিলেন ।

এভাবেই আমি সাইনবোর্ড দেখেই উপলব্ধি করেছিলাম কি কাজ এই সংস্থা করতে যাচ্ছে । তারপর মুক্তি বাহিনীর সময়কার সেক্টর গুলো বিলুপ্ত হয়ে গেল । রাজা ওর পরিবারের সাথে ঢাকা চলে গেল ; আমি এইডেড স্কুল থেকে চলে গেলাম শাহ পরান হাই স্কুলে । তারপর, অনেক শহর, বন্দর, নগরী ও স্কুল পরিবর্তন করে এক দিন বালক থেকে যুবক থেকে চাকরীজীবী হয়ে গেলাম বেমালুম। যুবক হবার সন্ধিলগ্নে পিছনে ফেলা আসা অনেক স্মৃতি ভুলে গেলাম তারুণ্যের উন্মাদনায় মনে হয় । ইতিমধ্যে ব্র্যাক এবং আমার জীবনেও এসেছে অনেক পরিবর্তন এবং পরিবর্ধন । সুরমা ভ্যালী দিয়ে ইতোমধ্যে গড়িয়ে গেছে খাসিয়া পাহাড়ের অনেক বালু, পাথর ও জল ।

Like and follow us on Facebook for all future news.

১৯৮৫ সালে প্রথম উপজিলা নির্বাচন এ আমাকে দায়িত্ব দেয়া হল পাবনা জেলার চলন বিল বিধৌত তিন টি উপ জেলার – চাটমোহর, ভাঙ্ঘুরা এবং ফরিদপুর এর । বাংলাদেশের সবচে’ বড় জলাশয়, বিল, হ্রদ যেখানে মোট ৪৭ টা নদীর পানিতে গড়ে উঠেছে এই ২৫ স্কয়ার মাইল বিস্তৃত এই বিশাল জলাভূমি – বর্ষা কাল তখন ; ঐ সময়ে একদিন দেখতে পেলাম সেই পুরাতন সাইনবোর্ড ‘’ ব্র্যাক’’ চাটমোহরে । দেখেই মনের পর্দায় ভেসে উঠলো সেই নাম । ড্রাইভার কে বললাম ঐ প্রাঙ্গণে প্রবেশ করার জন্য । দুটো কারন ছিল – এক নম্বর হল প্রতিষ্ঠানের নামটা খুবই পরিচিত লাগছিলো এবং পল্লী বিদ্যুৎ রেস্ট হাউসে পল্লী বিদ্যুতের জেনারাল ম্যানেজার নিজাম বলেছিলেন যে, এই সংস্থার লোকজন বলতে পারবে কিভাবে সহজ উপায়ে চলন বিলের মধ্যে বিস্তৃত ভোটকেন্দ্র গুলোতে আমার সৈনিক দের পৌঁছানো যাবে ভোটের দিন অথবা ভোটের আগের রাতে । প্রাঙ্গণে প্রবেশ করেই বুঝতে পারলাম যে এটা একটা বেশ পরিপাটি, পরিচ্ছন্ন কমপ্লেক্স । ওখানকার ম্যানেজার ভদ্রমহিলা আমাকে সব ঘুরে ঘুরে দেখালেন এবং একটা ছোট খাটো ব্রিফিং ও দিয়ে দিলেন হাঁটতে হাঁটতে । পরিচিত হলাম কয়েক জন মাঠ কর্মকর্তাদের সাথে – ওরা আমাকে আইডিয়া দিল কিভাবে ভোটকেন্দ্র তে যাওয়া যায় এবং কিভাবে সকালে ব্যালট পেপার গুলো সংগ্রহ করা যাবে সহজ ভাবে ; কথা প্রসঙ্গে এও জানলাম যে, প্রায় সবাই ই বিশ্ব বিদ্যালয় এ শিক্ষিত ।

কিন্তু, কাজ করে যাচ্ছে অক্লান্ত ভাবে ঐ এলাকার মহিলাদের উন্নয়নের জন্য , সামাজিক এবং অর্থনৈতিক উন্নতি সাথে ব্যাক্তিগত স্বাস্থ্য, হাইজিন, ডায়রিয়া নিরাময়ের নিমিত্তে ওরাল স্যালাইন বানানো এবং মুক্তআকাশের নীচে মলমূত্র ত্যাগ না করার প্রয়োজনিয়তা শিখানো । জীবনে এই প্রথম এন জি ও দের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হয়ে নিজেকে ধন্য মনে করলাম ।ঠিক তখনি ওখানকার ম্যানেজার ভদ্রমহিলাকে জিজ্ঞেস করলাম – আমার ছোট বেলার স্মৃতির কথা , বললাম যে, সেই ১৯৭২ সালে সিলেট শহরের মীরের ময়দান রোডে প্রথম দেখেছিলাম ব্র্যাক নামের একটা সাইনবোর্ড; এই ব্র্যাক কি সেই ব্র্যাক ? তখন উনি আমাকে ব্র্যাক এর প্রতিষ্ঠাতা এবং উনার সম্পর্কে সব বলেছিলেন । আমি তো আমার স্মরণশক্তির প্রখরতা দেখে নিজেই অভিভূত হয়ে গিয়েছিলাম । এবং সঙ্গে সঙ্গে জনাব আবেদ এর একজন প্রদীপ্ত অনুশিষ্য হয়ে গেলাম নিজের অজান্তে । নীরবে, নিভৃতে ওনাকে এবং ব্র্যাক এর সব কর্মকাণ্ড কেই অনুসরণ করতে থাকলাম তখন থেকেই ।

Subscribe our YouTube channel for all our future videos.

মাত্র ছয় হাজার পাউন্ড পুঁজি নিয়ে, নিজের বাসস্থান বিক্রি করে দিয়ে সেই পয়সা গ্রামের গরিব হত দরিদ্র মানুষের যুদ্ধবিধ্বস্ত, ঘর বাড়ী, ঠিক করে দেওয়ার মত একটা ওলাভজনক কাজে ,ঐ ঘর বিক্রয়লব্ধ টাকা লগ্নি করা কোটি কোটি মানুষের কাছে মনে হবে একটা বোকামি । কিন্তু, ঐ উদার মনের মানুষ টি ছিল এক ভিন্ন মানবিক গুণাবলীর । যাঁহার নিকট অন্যের সমস্যা সমাধান করাই ছিল প্রধান কাজ, তাই তো গত ৪৮ বছর যাবত নিরলস ভাবে সমাজ কে দিয়ে গেছেন তার মূল্যবান সেবা ।হাটিহাটি পা’ পা’ করে এগিয়ে নিয়ে গেছেন তাঁর স্বপ্নকে এবং রুপান্তারিত করেছেন বিশ্বের সর্ব বৃহৎ ওলাভজনক সামাজিক ব্যবসাতে । বাংলাদেশের লাল সবুজ রং দিয়ে সারা পৃথিবিকে মুড়ে দিয়েছেন । গড়ে তুলেছেন এক বিশাল ব্রান্ড – যেখানে তাঁর স্বপ্নের সাথে আমাদের জন্মভূমির নাম সারা জীবন সংক্রিপ্ত থাকবে অনাদিকাল যাবত ।

দেশ বিদেশ থেকে এই মহামানব কে দেওয়া হয়েছে অনেক অনেক সম্মান, সাহায্য এবং খেতাব, অত কিছুর পরও তাঁর প্রতিষ্ঠানের সকল সদস্য, মহিলা ম্যাক্রো ঋণ গ্রহীতাদের কাছে সে সব সময়ই রয়ে গিয়েছিলেন প্রিয় ”আবেদ ভাই” হিসাবে ।

তাঁর এবং তাঁর হাতে গড়া ব্র্যাক এর সকল কর্মকাণ্ডের জন্য আমাদের মহামান্য রানী দিয়েছেন তাঁহাকে স্যার উপাধি, ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ উপনেবেশিক সাম্রাজ্যের যবনিকা টানার পর এই প্রথম কোন বাঙ্গালি এই উপাধিতে ভূষিত হয়েছেন ।
কিন্তু, কেন জানি আমার হৃদয়ে এক টা অতৃপ্তি বার বার সন্তর্পণে আমাকে পীড়া দেয় তা আমি জানিনা – এই কারণে দেয় যে, কেন স্যার ফজলে হাসান আবেদ কে আজ ‘’ নোবেল’’ প্রাইজ দেওয়া হল না !

লেখতে যেয়ে বার বার অশ্রু সজল হয়ে উঠছে আমার নয়ন – তাঁর জীবন অবসানের শ্রধাঞ্জলি । বাংলাদেশ তথা
পৃথিবী হারিয়েছে এক জন ভাগ্যবান মহামানব কে, যে কিনা তাঁর জীবনের সকল কিছু বিলিয়ে দিয়েছিল অভাগ্যবান ভাগ্য উন্নয়নে ।

আসুন সবাই মিলে প্রার্থনা করি এই মহানুভব মানবের জাগতিক প্রস্থানের । সাথে সাথে আসুন প্রতিজ্ঞা করি , আমারা সকলে যেন তাঁর পদাঙ্ক অনুসরণ করে লাগভ করতে পারি আমাদের চেয়ে কম ভাগ্যবান দের কষ্ট, অসচ্ছলতা, তকলিফ ।

স্যার ফজলে হাসান আবেদ এর জন্ম হয়েছিল বৃহত্তর সিলেটএর হবিগঞ্জ এর বিখ্যাত গ্রাম বানিয়াচং এ ; বানিয়াচং এক সময় ঘোষিত হয়েছিল এশিয়া তথা বিশ্বের সর্ব বৃহৎ গ্রাম হিসেবে । ঐ বিশাল গ্রামেই জন্ম দিয়েছিলেন এই বিশাল, মহৎ, পরোপকারী অতি উচ্চ মানুষ টিকে । উঁনি গত ২০ ই ডিসেম্বার ২০১৯ এ ইহলোক ত্যাগ করেছেন ।

আবেদ ভাই বেঁচে থাকবেন আমাদের মননে আজীবন ।
লহ মোদের শ্রদ্ধা।

লেখক : ইমরান আহমেদ চৌধুরী
ইংল্যান্ড
এক জন লেখক এবং ইতিহাসবিদ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error

কোয়ালিটি নিউজ ও ভিডিও পেতে সাবস্ক্রাইব করুন।

http://www.britishbanglanews.com/150k
https://www.facebook.com/Britishbanglanews/121k
https://www.facebook.com/Britishbanglanews/
youtube.com/c/BritishBanglaNews18k
youtube.com/c/BritishBanglaNews
error: Content is protected !!