শ্রীমঙ্গলে প্রথম ‘জয়বাংলা’ শ্লোগান দেওয়ার অপরাধে গ্রেফতার হয়েছিলাম : এমএ রহিম


শ্রীমঙ্গলের সাবেক সাহসী ছাত্রনেতা ৬৯’ এর গণঅভ্যুত্থান, ৯০’র স্বৈরশাসক এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে অগ্রনীসেনা ৭১ এর বীর মুক্তিযোদ্ধা এম এ রহিম। ১৯৫৩ সালের ২০শে মে শ্রীমঙ্গলের রামনগরে এক সম্ভান্ত মুসলিম পরিবারে তাঁর জন্ম। তার বাবা হাজী রাশিদ মিয়া ও মাতা মেহেরজান। ছেলে বেলা থেকে অত্যন্ত মেধাবি এম এ রহিম পরিবারিক ভাবেই ছিলেন আওয়ামী ঘরনার সন্তান। জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে এ অঞ্চলে ছাত্রলীগ সু সংগঠনের সক্রিয় ভ‚মিকা পালন করেন। শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জ এলাকায় প্রথমে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ’র তৎকালীন শ্রীমঙ্গল থানার আহŸায়ক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। আইয়ুব খানের মার্শাল ল’ চলাকালে অনুষ্ঠিত সম্মেনে কাউন্সিলারদের ভোটে তিনি শ্রীমঙ্গল ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাকালীন সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৭১ সালে দেশমাতৃকার ডাকে সাড়া দিয়ে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন শ্রীমঙ্গল পৌরসভার সাবেক চেয়ারম্যান এম এ রহিম।

Like and follow us on Facebook for all future news.

একান্ত সাক্ষাৎকারে মুক্তিযুদ্ধ ও দীর্ঘ রাজনৈতিক কর্মকান্ড নিয়ে আলোচনা করেন এই বীর মুক্তিযোদ্ধা। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আমাদের শ্রীমঙ্গল প্রতিনিধি আবুজার বাবলা।

প্রশ্ন: ছাত্র রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ার প্রেক্ষাপট কি ছিল?
এম এ রহিম: ধন্যবাদ। আমি ছাত্রজীবন থেকেই রাজনৈতিক সচেতন ছিলাম। পাকিস্তানী শোষন বঞ্চনার হাত থেকে বাংলাদেশকে স্বাধীন ভ‚-খন্ড হিসেবে দেখার স্বপ্ন লালন করতাম। শ্রীমঙ্গলে ছাত্রলীগের কর্মকান্ড সক্রিয় করতে প্রথম ঢাকা গিয়েছিলাম। তৎকালীন ছাত্রলীগ সভাপতি আব্দুর রউপ ও ছাত্রলীগ দপ্তর সম্পাদক আ স ম আব্দুর রব সাহেবের সাথে কথা বললাম। তারা দু’জনকে সম্মেলনের প্রধান ও বিশেষ অতিথি রাখার কথা জানালাম। তখনও তাঁদেও মাথার উপর ছিলো গ্রেফতারি হুলিয়া। সব বাধা উপেক্ষা করে শ্রীমঙ্গলে ঐতিহাসিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনকে কেন্দ্র কওে ছাত্র জনতার এক বিশাল জনসভায় বক্তব্য রাখেন বর্তমান পৌর শহিদ মিনার মাঠে (সে সময় শহিদ মিনার ছিলনা)। মূলতঃ এটি ছিল শ্রীমঙ্গলে আওয়ামী ধারার রাজনীতির প্রথম প্রকাশ্য ছাত্র জনসভা।

Subscribe our YouTube channel for all our future videos.

প্রশ্ন: ৬৯’এর আন্দোলনে ছিলেন?
এম এ রহিম: হা । সে সময় আমি ছাত্র রাজনীেিত সক্রিয় ছিলাম। ১৯৬৯ সালে ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়নের কয়েক জন মিলে নির্মাণ করি ভাষা শহীদদের প্রথম শহিদ মিনার। অন্য ছাত্র সংগঠনগুলোর অধিকার আদায়ের বিভিন্ন ইস্যূ নিয়ে মাঠে ছিল। সে প্রবণতা স্কুল পর্যায়ে ছাত্র সংগঠন বিস্তৃতি লাভ করে। আমার নিজ উদ্যোগে তৎকালীন ভিক্টোরিয়া স্কুল, শ্রীমঙ্গল সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় (তৎকালীন দ্বীনময়ী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়) এ কমিটি গঠন করা হয়। এরপর পর্যায়ক্রমে ভৈরবগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়, আছিদ উল্লাহ উচ্চ বিদ্যালয়, ভুনবীর দশরথ উচ্চ বিদ্যালয়ে ছাত্রলীগে কর্মী সংগ্রহ ও প্রতিটি স্কুলে ছাত্রলীগের কমিটি গঠন করা হয়। তৎকালীন বৃহত্তর সিলেটের কিংবদন্তী আওয়ামীলীগ নেতা, বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ট সহচর মরহুম দেওয়ান ফরিদ গাজীর নের্তৃত্বে মরহুম মোঃ ইলিয়াস (প্রথমে এমএনএ পরে এমপি) মোঃ আলতাফুর রহমান এমপি, মরহুম ডা. আলি প্রমূখদের নিয়ে শ্রীমঙ্গলে আওয়ামীলীগ প্রতিষ্ঠা পায়। ছাত্রলীগনেতা হিসেবে এই গঠন প্রক্রিয়ায় আমিও ছিলাম অংশিদার।

প্রশ্ন: বঙ্গবন্ধুর সাথে কিভাবে সাক্ষাৎ হয়েছিল?
এম এ রহিম: বঙ্গবন্ধু জেল থেকে মুক্ত হওয়ার পরে দেশ সফরের অংশ হিসেবে শ্রীমঙ্গল সফরে আসেন। সেটি ছিল সাংগঠনিক সফর। তাজ উদ্দিন আহমেদ ছিলেন তাঁর সফরসঙ্গী। সেময় জাতির জনকের সংস্পর্শ পেয়ে আমি রাজনীতিতে আরো অনুপ্রাণিত হই।

প্রশ্ন: শোনা যায় ‘জয় বাংলা’শ্লোগান দেয়ার কারণে গ্রেফতার হয়েছিলেন?

এম এ রহিম: হাঁ। ১৯৬৯ সালে ঢাকায় তৎকালীন ছাত্রলীগের জাতীয় সম্মেলনে প্রথম জয়বাংলা শ্লোগান দেয়া হয়। ঐ সম্মেলনের উদ্বোধক ছিলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সম্মেলন শেষে ঢাকা থেকে ফেরার পর শ্রীমঙ্গলস্থ মৌলভীবাজার রোডে ‘জয়বাংলা’ শ্লোগান দেওয়ার অপরাধে রাতেই পুলিশ আমাকে গ্রেফতার করে। শ্রীমঙ্গলে এটাই কোন রাজনীতিকের প্রথম কারান্তরীনের ঘটনা, সেটাও আবার শ্লোগান দেয়ার অপরাধে।

প্রশ্ন: ৭০ এর নির্বাচন?
এম এ রহিম:৭০’ এর নির্বাচন দেশের ইতিহাসে একটি টার্নিং পয়েন্ট ছিল। এর গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। যে কারনে এ নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জ এ দুই থানায় নেতৃবৃন্দের সাথে আমরা সক্রিয় ভাবে নির্বাচনী প্রচার অভিযানে যোগ দেই। সে সময় কাঁধে মাইক বেঁধে পায়ে হেঁটে প্রচার অভিযান চালাই। ১৯৭০ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু ২য় বারের মতো শ্রীমঙ্গল সফরে আসেন। শ্রীমঙ্গল পৌরসভা মাঠে এক বিশাল জনসভায় তিনি বক্তব্যে নির্বাচনে আওয়ামীলীগকে ভোট দেয়ার কাজে নেমে পড়ার আহবান জানান। সে সময় জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর পাশে ছিলেন দেওয়ান ফরিদ গাজী ,সিরাজ উদ্দিন প্রমূখ। (এই ঐতিহাসিক মাঠটি বর্তমানে বিএনপির প্রভাবশালী নেতা ও শ্রীমঙ্গল পৌরসভার মেয়র কর্তৃক দেয়াল দিয়ে আলাদা করা হয়েছে) জনসভা চলাকালীন সময় মুসলিমলীগের কর্মীরা মাইকিং করছিল। তাদের মাইকের আওয়াজ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু’র কানে আসলে তিনি নিজের বক্তব্যের মধ্যে বজ্র কন্ঠে বলেছিলেন “খামোশ”। সারা মাঠে মুহূর্তের জন্য বয়ে গেল পিনপতন নীরবতা। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু’র এই ভাষণটি ছিল শ্রীমঙ্গলবাসীদের জন্য একটি ঐতিহাসিক ও স্মরণীয় দিন। শ্রীমঙ্গল বাসী কাছ থেকে তাদের প্রাণের নেতাকে দেখেছিল আর শুনেছিল তাঁর জ্বালাময়ী ভাষণ। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু’র ভাষণে মানুষ এতটাই অনুপ্রাণিত হয়েছিল যে, মুসলিম লীগের ভয় ভীতি উপেক্ষা করে দলবল নির্বিশেষে আওয়ামীলীগকে সে নির্বাচনে বিপুল ভোট জয়যুক্ত করেছিল।

প্রশ্ন: মুক্তিযুদ্ধে কিভাবে জড়ালেন?
এম এ রহিম: মূলত ৭ই মার্চের অগ্নিঝরা ঐতিহাসিক ভাষণ আমাতে মুক্তিযুদ্ধে টেনে নিয়ে গেছে। স্থানীয় চা শ্রমিকদের নিয়ে দেশীয় অস্ত্র -দা, বল্লম, দেশীয় বন্দুক, চা শ্রমিকদের তীর-ধনুক ইত্যাদি নিয়ে মুক্তিযুদ্ধেও জন্য প্রস্তুতি নেই আমরা। ২৫শে মার্চ এ স্বাধীনতার ঘোষণা রেডিওতে শুনে মৌলভীবাজার থেকে শ্রীমঙ্গল আসার পথে মুক্তিযোদ্ধারা সমস্ত ব্রিজ কালভার্ট গুঁড়িয়ে দেয়। কেননা সেসময় পাক হানাদারদের মৌলভীবাজার কেন্দ্রিক মুভমন্ট ছিল। পরবর্তিতে হবিগঞ্জ থেকে কমান্ডেন্ট মানিক চৌধুরী, সি আর দত্ত, কর্ণেল রব প্রমূখের নেতৃত্বে আনসার, পুলিশের সমন্বয়ে মুক্তি বাহিনী গঠন করা হয়। আমি সঙ্গীয় কয়েকজন নিয়ে ঐ বাহিনীতে যোগ দেই। য্ধুসঢ়;ধ শুরু হলে মেজর খালেদ মোশারফের নেতৃত্বাধীন ক্যাপ্টেন আজিজ (পরে অবঃ মেজর জেনারেল আজিজুর রহমান, বীর উত্তম) সহ সম্মিলিত বাহিনী একপর্যায়ে মৌলভীবাজার থেকে সিলেট পর্যন্ত মুক্ত করে নেয় কিন্তু পাক হানাদারদের আকাশপথে আক্রমনের ফলে পুরো বাহিনী পিছু হঠতে বাধ্য হন এতে সিলেট থেকে ফেরার পথে সম্মুখ যুদ্ধে অনেক মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। যার মধ্যে শ্রীমঙ্গলেরও অনেকেই ছিলেন। এসময় আমি কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধাসহ শ্রীমঙ্গল হয়ে ভারতের কমলপুরে এবং আষাড়ামবাড়িতে গিয়ে আশ্রয় নেই। সেখান থেকেই শেখ ফজলুল হক মণি’র নেতৃতে গঠিত মুজিব বাহিনীতে যোগ দেই। আমার উপর দায়িত্ব পড়ে মুজিব বাহিনীর জন্য সদস্য সংগ্রহ করা এবং ট্রেনিং ক্যাম্পে পাঠানো। যাতে তারা প্রশিক্ষণ শেষে দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ ও গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করা। মৌলভীবাজারে মুজিব বাহিনীর জেলা ভিত্তিক সার্বিক দায়িত্বে ছিলেন মাহমুদুর রহমান ও ফয়জুর রহমান প্রমূখ। ভূনবীর (বাবুরবাজার) জমিদার পরিবারের সন্তান এলাকার বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব গংগেশ দেব রায়ের মাধ্যমে সংগ্রহ করেন আছকির মিয়া, সিন্দুরখাঁনের কনোজ কান্তি দেব, জমির মিয়া প্রমুখ নেতাকে। তাদেরকে পরবর্তিতে মুজিব বাহিনীর জেলা ভিত্তিক প্রধানদের নিকট প্রেরণ করা হয়। জেলার সদস্যদের ট্রেনিং সম্পন্ন হলে মূল ট্রেনিং ক্যাম্প পাঠানো হয়আষাড়ামবাড়িতে। এখনো মনে আছে প্রথম ব্যাচে যারা ছিলেন তাদের মধ্যে দেওয়ান আব্দুল ওহাব, মুকিত, রানু, সমির সোম, তোফা, প্রমূখদের। প্রায় ২৫ জনের ছিল ব্যাচটি। এই ব্যাচটি ছিল সবচেয়ে বড়। এই ব্যাচটির ৬ জন সদস্য সাঁতগাও এলাকায় রাজাকার বাহিনীর সহযোগিতায় হানাদার বাহিনীর হাতে ধরা পড়ে। বাকিরা পালিয়ে যায়, কেউ কেউ ফেরত চলে আসে ভারতে। এদেশীয় রাজাকার- আলবদররা ও পাক হানাদার বাহিনী মিলে নির্মমভাবে হত্যা করে ধরা পড়া বাংলার সূর্য সন্তানদের। ভারতে বসেই খবর পাই ৬ ডিসেম্বও শ্রীমঙ্গল হানাদার মুক্ত হয়। অবশেষে দীর্ঘ নয় মাস যুদ্ধ শেষে দেশে ফিরে দেশ পূনর্গঠনে অংশ গ্রহন করি।

প্রশ্ন: ৭৫ এর পট পরিবর্তন কিভাবে দেখেছেন?
এম এ রহিম: হৃদয় বিদারক ও বিয়োগান্তক ৭৫ এর ১৫ আগষ্টের কাল রাতের ঘটনায় দেশের মানুষ সেদিন স্থম্ভিত হয়ে পড়ে। সে রাতে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে স্বপরিবারে হত্যার পর অনেকেই ভেবেছিলেন আওয়ামীলীগ আর থাকবে না। বিভিন্ন স্বৈরাচার শাসন আমলে তাঁরা বহু নির্যাতন, জেল জুলুম চালায়। কিন্তু আমরা দলকে ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছি। স্বৈরাচারী সামরিক শাসকদের দুঃশাসনের আমলে আমরা স্থানীয় ভাবে নির্যাতিত হয়েছি তবুও দলকে আরো সংঘটিত করেছি। দলের অনেকেই বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা, রাজনৈতিক আপোষ করে জাতীয় পার্টি যোগ দেয়। কিন্তু আমি ও আমার ছোট ভাই মো. ইউসুফ আলি, মরহুম ইসমাইল হোসেন, ডা. রমা রঞ্জন দেব সহ আরো অনেকে জেল জুলুমের ভয়কে তোয়াক্কা না করে রামনগর, জানাউড়া, সিন্দুরখাঁন, ছিক্কা, সাতগাঁও এলাকার অধিকাংশ ছাত্র জনতাকে দলের সংগে সম্পৃক্ত রেখে ছাত্রলীগও যুবলীগ এবং আওয়ামীলীগকে সুসংঘটিত রাখতে দূর্নিবার সংগ্রাম করেছিলেন।

(এম এ রহিম- বিশিষ্ট আওয়ামীলীগনেতা, সাবেক পৌর চেয়ারম্যান শ্রীমঙ্গল পৌরসভা ও প্রকাশক সাপ্তাহিক ‘শ্রীমঙ্গলের চিঠি’)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error

কোয়ালিটি নিউজ ও ভিডিও পেতে সাবস্ক্রাইব করুন।

http://www.britishbanglanews.com/150k
https://www.facebook.com/Britishbanglanews/121k
https://www.facebook.com/Britishbanglanews/
youtube.com/c/BritishBanglaNews18k
youtube.com/c/BritishBanglaNews
error: Content is protected !!