রমনা রেসকোর্স থেকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান নাম যে ভাবে হলো

রমনা রেসকোর্স ময়দানের এই ছবিটি ১৮৯০ সালে তোলা। ছবিটি ব্রিটিশ লাইব্রেরির ওয়েবসাইটে পাওয়া গেছে।

নিউজ ডেস্ক ,লন্ডন : ‘এই শিশু পার্ক সেদিন ছিল না/ এই বৃক্ষে ফুলে শোভিত উদ্যান সেদিন ছিল না/ তা হলে কেমন ছিল সেদিনের সেই বিকেল বেলাটি?/ তা হলে কেমন ছিল শিশু পার্কে, বেঞ্চে, বৃক্ষে, ফুলের বাগানে ঢেকে দেওয়া এই ঢাকার হৃদয় মাঠখানি?’ কবি নির্মলেন্দু গুণের ‘ঢাকার এই হৃদয় মাঠখানি’ আজকের সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, যা ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও বিজয়ের ইতিহাসে।

বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান নামেই সবাই জায়গাটি সবাই চেনে। কিন্তু রমনা রেসকোর্স বললে এই প্রজন্মের অনেকেই হয়তো বা জায়গাটি খুঁজে না-ও পেতে পারেন। L

রেসকোর্স থেকে সোহরাওয়ার্দী : মোগল আমলে রাজধানী ঢাকার কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত সুপরিসর এই নগর উদ্যান গড়ে উঠেছিল রমনা নামে। মোগল সাম্রাজ্য পতনের সঙ্গে সঙ্গে রমনাও তার সৌন্দর্য হারায়। ১৮২৫ সালে ঢাকার ইংরেজ কালেক্টর মি. ড’স ঢাকা নগরীর উন্নয়নে কিছু পদক্ষেপ নেন। ড’স জেলের কয়েদিদের নিয়ে রমনার জঙ্গল পরিষ্কার করে বের করে এনেছিলেন ডিম্বাকৃতির একটি অংশ, যার ফলে শহরের উত্তরাঞ্চল পরিচ্ছন্ন হয়ে উন্মুক্ত হয়েছিল বায়ু চলাচলের পথ। প্রতিদিন সকালে সাহেবরা এই এলাকায় বেড়াতে আসতেন, এমনকি প্রাতঃভ্রমণ শেষে ইউরোপীয়রা মিলিত হতেন ড’সের টিলায় কফি খেতে।

রেসকোর্স ময়দানে ঘোড়া দৌড়ের ছবি

জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়ায় বলা হয়েছে, ১৬১০ সালে মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীরের শাসনামলে সুবাদার ইসলাম খান ঢাকা নগরী প্রতিষ্ঠা করলে রমনার ইতিহাস শুরু হয়। কিন্তু মোগল সাম্রাজ্যের পতনের পর রমনা ধীরে ধীরে তার পুরোনো গৌরব হারিয়ে ফেলে।

ব্রিটিশরা এই অঞ্চলে শাসন ভার হাতে পেয়ে ১৮২৫ সালে ব্রিটিশ কালেক্টর ডয়েস এখানকার জঙ্গল পরিষ্কার করে রমনাকে পরিচ্ছন্ন করে নতুন রূপ দেন, এবং এর নাম রাখেন ” রমনা গ্রিন”।

ব্রিটিশ আমলে প্রতি রোববার এখানে ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হতো। ঘোড়দৌড় বা হর্স রেস হতো বলে জায়গাটির নাম হয় “রেসকোর্স ময়দান ”

এটি ছিল একই সঙ্গে ব্রিটিশ শাসক ও সর্বস্তরের মানুষের চিত্তবিনোদনের একটি স্থান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ড. শরীফ উদ্দিন আহমেদের এক বিবরণ থেকে জানা যায়, চার্লস ডজ রমনায় রেসকোর্স বা ঘোড়দৌড়ের মাঠ নির্মাণ করেন। তিনি রেসকোর্স হিসেবে ব্যবহারের জন্য কাঠের বেড়া দিয়ে জায়গাটি ঘিরে দেন। এরপর সেখানে ঘোড়দৌড় খুবই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

পরে, ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর ঢাকার খ্যাতনামা আলেম মুফতি দীন মহম্মদ এক মাহফিল থেকে ঘৌড়দৌড়ের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করেন। এ কারণে পাকিস্তান সরকার ১৯৪৯ সালে সেখানে ঘৌড়দৌড় বন্ধ করে দেয়।

১৮৫১ সালে রেসকোর্সের উত্তর কোণে ব্রিটিশ আমলারা ঢাকা ক্লাব স্থাপন করেন। ১৯০৫ সালে লর্ড কার্জনের শাসনামলে গভর্নরের সরকারি বাসভবন স্থাপনের জন্য রমনাকে নির্বাচন করা হয়। বৃহত্তর রমনা এলাকায় ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলে এখানকার গুরুত্ব অনেক বেড়ে যায়।

১৯৬৯ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জেল থেকে মুক্তি পেলে রমনা রেসকোর্স ময়দানে তাঁকে নাগরিক সংবর্ধনা দিয়ে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়।

১৯৭১ সালের ৩ জানুয়ারি আওয়ামী লীগ রমনা রেসকোর্স ময়দানে মহাসমাবেশের আয়োজন করে। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রমনা রেসকোর্স ময়দানে মহাসমাবেশে বঙ্গবন্ধু তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণ দেন ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’। ১৬ ডিসেম্বর এখানেই হানাদার পাকিস্তানি সেনারা আত্মসমর্পণ করে।

এবং ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর জাতীয় নেতা হোসেন শহীদ সোহ্রাওয়ার্দীর নামানুসারে রমনা রেসকোর্স ময়দানের নাম পরিবর্তন করে “সোহরাওয়ার্দী উদ্যান” নাম রাখা হয়। ১৯৭০ দশকের শেষভাগ থেকে শুরু করে এখানে প্রচুর গাছ-গাছালি রোপণ করা হয়।

বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংক্রান্ত যেসব ঐতিহাসিক ঘটনা অনুষ্ঠিত হয়েছে, তা স্মরণীয় করে রাখতে ১৯৯৯ সালে এখানে ‘শিখা চিরন্তন’ স্থাপন করা হয়। সব মিলিয়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান এই ভূখণ্ডের বহু ইতিহাসের সাক্ষী।

বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান

Please follow and like us:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Facebook
YouTube
error: Content is protected !!