বিহারি বাঙালি দ্বন্দ্ব ; ৭২ বছরের এক অবিশ্বাসের জীবন কাহিনী

নিউজ ডেস্ক : হাম লোগ বিহারি, ইয়ে সা”চা। লেকিন হামতো ইনসান হু। মেরি পাস বিবি-বা”চা থে। তুম লোগোকো ইয়ে সামাজ না আতে। লেকিন কিউ? (আমরা বিহারি ঠিক আছে, কিন্তু আমরা তো মানুষ। আমাদেরও বউ বাচ্চা আছে। তোমরা এটা বুঝতে চাও না। কিন্তু কেন?

বাংলাদেশে বিহারি বাঙালির দন্ধ শুরু হয় ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে। এ সময় বাংলাদেশ ছিল ১৯৪৭-এ সৃষ্ট পাকিস্তান রাষ্ট্রের পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশ পূর্ব পাকিস্তান। বিহারীদের আদি নিবাস পাকিস্তান ছিল না যদিও, কিন্তু তাদের ভাষা উর্দু হওয়ার কারণে তাদেরকে পশ্চিম পাকিস্তনীদের সমজাত গণ্য করে বিহারি বাংলালির এই দন্ধ শুরু হয়। পরবর্তীকালে তাদের একাংশ পাকিস্তান সামরিক বাহিনীকে সহায়তা প্রদান করলে এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের বিপক্ষে ভূমিকা রাখলে তারা সাধারণভাবে বাঙালি জনগণ ও মুক্তিযোদ্ধাদের শত্রুতে পরিণত হয়।

Like and follow us on Facebook for all future news.

মুক্তিযুদ্ধের ফলে ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসাবে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হলেও বিহারিদের সাথে বাঙালির দ্বন্দ্ব ও বৈরিতা অব্যাহত থাকে।

কারা এই বিহারি ?
১৯৪৭ সালে ভারত ও পাকিস্তান নামে দুই আলাদা রাষ্ট্র তৈরি হলে-উর্দুভাষী অনেকে চলে আসেন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে। এদের বেশির ভাগ আসেন ভারতের বিহার রাজ্য থেকে। পূর্ব পাকিস্তানের স্থানীয় মানুষের ভাষা ছিল বাংলা। সাংস্কৃতিক ভিন্নতাও ছিল। ফলে সব মিলিয়ে এই কয়েক লক্ষ লোকের আগমন পূর্ব পাকিস্তানের বাঙ্গালীদের কাছে আগন্তুকের মত ছিল।

Subscribe our YouTube channel for all our future videos.

তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের করা যাটের দশকের শেষাংশে পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে পূর্ব পাকিস্তানে ( বর্তমান বাংলাদেশে) ২০ লক্ষ উর্দুভাষী আসেন। মূলত ধর্মীয় দাঙ্গার সময় জীবন বাঁচাতে এ দেশে এসেছিলেন তারা।

আবার অন্যদিকে উর্দুভাষীরাও যুগের পর যুগ ধরে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান এবং এখনকার বাংলাদেশে বাস করলেও ঠিক বাংলাদেশের মুল সমাজে মিশতে পারেননি। এর কারণ কি?

উর্দুভাষী মুহাম্মদ এরফানের জন্ম বাংলাদেশে। তিনি বলেন , “বিহারি বলেই আমাদের আলাদা করে রাখা হয়, আমরা কেন ক্যাম্পে থাকবো? আমার বাবা-মা না হয় বিহারী ছিল কিন্তু আমার তো জন্ম বাংলাদেশে তাহলে কেন এই বৈষম্য? আমার নিজেরো প্রশ্ন এটাই”।

বিহারীদের অনেকেই মনে করেন তাদের প্রতি বছরের পর বছর বৈষম্যমূলক আচরণ করে আসছে বাংলাদেশের মানুষ। তবে স্থানীয় বাঙ্গালীদের রয়েছে অন্য যুক্তি।

আমিনুল হকের স্থানীয় সাংবাদিক, সৈয়দপুরের বাসিন্দা তিনি। বলছিলেন প্রচন্ডভাবে এই বিভেদ লক্ষ করা যায়।

মি. হকের মতে “দীর্ঘদিন তাদের সাথে উঠা-বসা করে মনে হয়েছে-তারা মনে করে বাংলাদেশ সৃষ্টি সঠিক ছিল না। তাছাড়া ভাষাটা একটা বড় ব্যাপার। তারা সব সময় পাকিস্তান যেতে চেয়েছে। যারা বাংলাদেশকে মানে না, তাদের সাথে আমাদের সম্পর্ক কিভাবে গড়ে উঠবে”।

১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের পর পরেই যে সমস্যাটা প্রধান হয় সেটা হল পূর্ব পাকিস্তানে আসা উর্দুভাষীদের- মন-মানসিকতা।

“বাংলাদেশে ভারতীয় অভিবাসী” নামে একটি বিশ্লেষণধর্মী বইতে উল্লেখ করা হয়েছে বাংলা ভাষা কে তারা আপন করে নিতে পারেন নি। ভাষা ছাড়াও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের পার্থক্যের কারণে তারা স্থানীয় জনতা থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে রাখতেন।

বইটির লেখক একবি আহমদ ইলিয়াসের বলেন “উর্দুভাষীদের অনেকেই এক ধরণের শ্রেষ্ঠত্বমন্যতায় ভুগছিলেন তাদের দক্ষতা,শিক্ষা ও সামাজিক মর্যাদার কারণে। এর ফলে আর্থিক বা সামাজিক বন্ধন গড়ে উঠেনি যা পড়ে বিহারী বা অবাঙ্গালীদের সাথে বাঙ্গালী জনসাধারণ থেকে তাদের পৃথক করে তোলে”।

ভারত-ভাগের ফলে ৭২ বছর আগে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে অনেক মুসলমান উর্দুভাষীরা চলে আসেন। শুরুটা সেখান থেকে হলেও পরে এর একটা রাজনৈতিক রূপ পায়। উর্দুভাষী মানুষেরা বেশিরভাগই চেয়েছিল পাকিস্তান নামের রাষ্ট্রের নাগরিক হতে।

তাঁদের একটি অংশ পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠীর সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে চলে। আর পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠী পূর্ব পাকিস্তানে তাদের নিয়ন্ত্রণ রাখার জন্য তাদেরকে তথ্যদাতা বা সহকারী হিসেবে অনেকটা ব্যবহার করে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক মেসবাহ কামাল তার একটি বইয়ে লিখেন , ১৯৭১ সালে বিহারীদের কর্মকাণ্ড স্থানীয় বাঙ্গালীদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি করে যেটাতে পরিস্থিতি আরো জটিল আকার ধারণ করে।

“১৯৭১ সালে পরিষ্কার বিভেদ তৈরি হয়। কিছু কিছু উর্দুভাষী পাকিস্তানিদের ‘কোলাবরেটর’ হিসেবে যে ভাবে কাজ করে সেটাকে সাধারণ মানুষ বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠে। স্বাধীনতার পরে তাদেরকে এক-পাক্ষিক ভাবে দেখা হয়েছে। যদিও বাংলাদেশে জন্ম নেয়া পরের প্রজন্ম এটাতে জড়িত ছিল না। কিন্তু তাদেরকেও এক কাতারে ফেলা হয়েছে। যেখান থেকে আজ পর্যন্ত বের হয়ে আসতে পারেনি” ।

মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস বিহারী জনগোষ্ঠীর একাংশের বাঙ্গালী-বিরোধী ভূমিকা বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে প্রচারিত হয়।

‘রেপ অফ বাংলাদেশ’ বই এর লেখক অ্যান্থনি মাসকারেনহাসের বর্ণনা অনুযায়ী “হাজার হাজার মুসলিম যারা বিহার থেকে আগত তাদের নির্মমভাবে নিশ্চিহ্ন করে ফেলা হয়েছিল। চট্টগ্রাম, খুলনা ও যশোরের মত বড় শহরগুলোতে ২০ হাজারের বেশি অবাঙ্গালীর লাশ পাওয়া গিয়েছিল”। তবে ঠিক কী পরিমাণ বিহারী জনগোষ্ঠী হত্যাকাণ্ডের শিকার হয় তার সঠিক কোন হিসাব পাওয়া যায়নি।

৭২ বছরে দুই জনগোষ্ঠীর মধ্যেকার বিশ্বাস,আস্থা তলানীতে গিয়ে ঠেকেছে। বর্তমানে বাংলাদেশে তেরোটা ভিন্ন-ভিন্ন অঞ্চলের ১১৬টা ক্যাম্পে প্রায় ৫ লাখের মতো উর্দুভাষী ( বিহারী ) মানুষ বসবাস করছে।

সম্প্রতি বাংলাদেশের সরকার উর্দুভাষীদের সুপ্রিম কোর্টের আদেশে বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। কিন্তু তাতে করে কি সমস্যার সমাধান হয়েছে?

ঢাকায় মিরপুর এবং মোহাম্মদপুরে রয়েছে দুটি বড় ক্যাম্প। যেখানে প্রায় তাদেরকে উচ্ছেদের অভিযোগ উঠে। তারা এদেশের শিক্ষা, চাকরি থেকে শুরু করে সব স্থানে বৈষম্য দেখতে পাচ্ছেন । এখনো কোন কিছু হলেই তাদেরকে ‘ বিহারীর বাচ্চা’ বলে গালি শুনতে হয়।

বাঙ্গালী সমাজে মিশতে না পাড়ার ক্ষেত্রে উর্দুভাষী বিহারীদের রয়েছে তাদের নিজস্ব যুক্তি। আর বাঙ্গালীদের রয়েছে তাদের ব্যাখ্যা।

তবে এই যুক্তিতর্ক থেকে একটা বিষয় অত্যন্ত পরিষ্কার যে- ভাষা, সংস্কৃতি এবং রাজনৈতিক ইতিহাসের একটা বড় প্রভাব এখনো কাজ করছে দুই জনগোষ্ঠীর মানুষের মধ্যে। এর পরেও সবচাইতে বড় কথা , তারাও মানুষ। তাই মানুষের মাঝে মানুষের জীবনের এই দ্বন্দ্বের অবসান হল। সেই আশা করি।

তথ্যসূত্র : বিবিসি ও ইন্টারনের ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error

কোয়ালিটি নিউজ ও ভিডিও পেতে সাবস্ক্রাইব করুন।

http://www.britishbanglanews.com/150k
https://www.facebook.com/Britishbanglanews/121k
https://www.facebook.com/Britishbanglanews/
youtube.com/c/BritishBanglaNews18k
youtube.com/c/BritishBanglaNews
error: Content is protected !!