পাক সেনাদোসর পুত্রের কবলে ৭১’র ৫নং সাব সেক্টরের ‘মুক্তির মঞ্চ’ সহ কোটি টাকার সরকারি সম্পদ

সিলেট ব্যুরো : ০৩.১২.১৯ একাওরের মহান স্বাধীনতা ও মুক্তিযোদ্ধের ৫নং সেক্টরের ‘মুক্তির মঞ্চ’ সহ কয়েক কোটি টাকার সরকারি সম্পদ দখলে নেয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।, এ নিয়ে শতাধিক বীরমুক্তিযোদ্ধা স্বাক্ষরিত লিখিত অভিযোগপত্র সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসক,তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার সহকারি কমিশনার (ভুমি) বরাবর টাকা কয়েক বছর ধরে দেয়া হয়।

কিন্তু অদৃশ্যকারনে দখল হওয়া সরকারি জমি ও ‘মুক্তির মঞ্চ’ উদ্ধার কেবল নোটিশেই সীমাবদ্ধ রেখেছেন প্রশাসন।এ দখল বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে সুনামগঞ্জের তাহিরপুরের তরং গ্রামের প্রয়াত আব্দুর রউফ তালুকদারের ছেলে শামীম আহমদ তালুকদারসহ বেশ ক’জন প্রভাবশারীর বিরুদ্ধে।

বীরমুক্তিযোদ্ধাগণ তাদের দেয়া লিখিত অভিযোগে জানান, সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার বড়ছড়া মৌজার ১নং খতিয়ানভুক্ত এসএ ও আরএস দাগে ৭৬.৩৬ একর সরকারি জমি রয়েছে। ওই মৌজার ওই দাগে খতিয়ানের থাকা প্রায় এক (১) একর জমি জুড়ে থাকা ৭১’র মুক্তির মঞ্চ, সমাবেশ স্থল, ছোট মাঠ, তিনটি ভবন, ভবনের ভেতর থাকা চেয়ার, টেবিল, আলমিরা, সোফা, টেলিভিশন,খেলাধুলার উপকরণ,১২টি জোড়া ড্রাম, মুল্যবান লোহাজাত সামগ্রী, অর্ধশত ফলদ,বনজ দুর্লভ প্রজাতির বৃক্ষ,দুটি টয়লেটসহ প্রায় এক(১)একর জমি দখলে নেন পাকসেনাদের দোসর আব্দুর রউফের ছেলে শামীম আহমদের নেতৃত্বে থাকা একদল ভুমিখেকো দানবচক্র।

প্রত্যুষা : বিবিসি বাংলার সকালের খবর – 03/12/19

এরপর ২০১৫ সালে রাতের আঁধারে ব্যাক্তি মালিকানাধীন নাম সবস্ব একটি কিন্ডার গার্ডেন ’র সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দেন। পরবর্তীতে জনসমাগম ও প্রশাসনের দৃষ্টিতে দখলবাণিজ্য আড়াল করতে জনচলাচলেরএকমাত্র কাঁচা সড়কটিও লোহাজাত সামগ্রী দিয়ে বন্ধ করে দেয়া হয়।

শুধু সরকারি কোটির টাকার জমি দখলই নয় ওই জমির উপর থাকা বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ড্রাষ্ট্রিজ কর্পোরেশন(বিসিআইসি)’র ছাতক সিমেন্ট ফ্যাক্টরী লিমিটেডের’র ট্যাকেরঘাট চুনাপাথর খনি (পতিত) প্রকল্পের প্রায় ৩০ লাখ টাকা মুল্যের শ্রমিক কর্মচারী ক্লাব,শ্রমিক ইউনিয়ন ভবন,শ্রমিক কর্মচারী ক্যান্টিন সহ তিনটি প্রতিষ্ঠানের যাবতীয় আসবাবপত্র সহ দখলে নিয়েছেন শামীম গংরা।

অভিযোগ রয়েছে, পাক সেনাদের দোসর প্রয়াত আব্দুর রউফ তালুকদারের ছেলে শামীম আহমদ তালুকদার ‘মুক্তির মঞ্চ’সহ সরকারি সম্পদ দখলের নেতৃত্বে রয়েছেন বলেও তারা অভিযোগে উল্ল্রেখ করেন।

মঙ্গলবার বিকেলে উপজেলার শ্রীপুর উওর ইউনিয়ন মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা আলকাছ উদ্দিন বললেন, মুক্তির মঞ্চ , সমাবেশস্থল, ছোট মাঠ, তিনটি ভবন টিনশেড বেষ্টনীতে অবরুদ্ধ করে রেখে বাহিরে কিন্ডার গার্ডেন’র সাইনবোর্ড ঝুলালেও মুলত ভেতরে শামীম গংরা ভবনগুলো বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নিকট সময় সময়ে ভাড়া প্রদান, গরু চড়ানোর মাঠ, মালবাহি লরি পিকআপ ভ্যান রাখা, নিজেদের ব্যাক্তিগত অফিস হিসাবেই ব্যবহার করে আসছেন।

উপজেলার মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক ডেপুটি কমান্ডার (অব. সেনা সদস্য) বীর মুক্তিযোদ্ধা ধন মিয়া জানান, প্রশাসনের উদাসীনতা, রাজনৈতিক দলের গুটি কয়েক নেতার তদবীর বাণিজ্যের কারনে বারবার থেমে যাচ্ছে কয়েক কোটি টাকার মুল্যের দখলে থাকা সরকারি জমি ও ‘মুক্তির মঞ্চ’ উদ্ধারকাজ।

তিনি আরো বলেন, উচ্ছেদের প্রসঙ্গ আসলেই দু’হাতে টাকা খরচ করে আর তদবীরের মুখেই থামিয়ে দেয়া হয় মুক্তিযোদ্ধাদের প্রাণের দাবি ‘মুক্তির মঞ্চ’ উদ্ধার কাজ।, বিসিআইসির ট্যাকেরঘাট চুনাপাথর খনি প্রকল্প উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী শামসুল আরেফিন সুইট, আবুল ফয়েজ মন্টু, সজিব আহমদে সজল জানান, যে জায়গাটি বা ভবনগুলো শামীম গংরা দখলে নিয়েছেন তা কেবল দখল বাণিজ্যের নেতিবাচক চর্চার ফসলই নয় এখানে থাকা মুক্তির মঞ্চ ও মাঠে মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ের পর থেকেই ভাষা, স্বাধীনতা, বিজয় দিবস,জাতীর জনক বঙ্গ বন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শোক দিবস, প্রয়াত শহীদ মুক্তিযোদ্ধাগণের শোক-স্মরণ সভা পালন সহ রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন দিবস, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সভা সমাবেশ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান,গণমিলন কেন্দ্র, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক খেলাধুলা ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান হয়ে আসছিলো।

উপজেলার যোদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সাবেক জেলা কমান্ডার আলহাজ্ব মোজাহিদ উদ্দিন আহমদ বলেন, ৭১’র মহান স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে তাহিরপুরের শ্রীপুর উওর ইউনিয়নের নয়াবন্দ গ্রামের প্রয়াত শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান চিহ্নিত এক রাজাকার তরং গ্রামের প্রয়াত আব্দুর রউফ তালুকদারের ভগ্নিপতি (চাচাত বোনের জামাই) ছিলেন।, সেই রাজাকার ভগ্নিপতির সাথে আব্দুর রউফ সে সময় পাকিস্থানী সেনাদের দোসর হিসাবে স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধবিরোধী কর্মকান্ডে নিজেকে সক্রিয় রাখেন।

মঙ্গলবার বিকেলে শামীম আহমদ তালুকদার তার বিরুদ্ধে আনা সকল অভিযোগ অস্বীকার করলেও তিনটি ভবনসহ ৭৫ শতাংশ সরকারি জমি দখলে নেয়ার কথা স্বীকার করে বলেন, জেলা প্রশাসকের নিকট আবেদন করলেও ওই জমি এখনো আমাদের বন্দোবস্থ দেয়া হয়নি।,জেলা প্রশাসক কতৃক বন্দোবস্থ না দেবার পুর্বেই কোন আইনে সরকারি জমি দখলে নিলেন? এমন প্রশ্নের উওরে তিনি বলেন, আমরা চেষ্টা করছি জমিটি বন্দোবস্থ পেতে আশা করি খুব শীঘ্রই তা পেয়েও যাব।

তার পিতা প্রয়াত আব্দুর রউফ পাকিস্থানী সেনাদের দোসর ছিলেন না দাবি করে তিনি আরো বলেন, যে জায়গা দখলের অভিযোগ করা হয়েছে সে জায়গায় আপাতত কিন্ডার গার্ডেন চালু করা হয়েছে ,সেখানে মুক্তির মঞ্চ বা মুক্তিযুদ্ধের কোন কিছুই ছিলনা।

তিনি আরো জানান,তাহিরপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক এ কিন্ডার গার্ডেনের সভাপতি স্বপন কুমার দাস,সহ – সভাপতি কয়লা ব্যবসায়ী পুইট্যার রিয়াজ উদ্দিন, সাধারন সম্পাদক আমি নিজে,যুগ্ন সম্পাদক কয়লা ব্যবসায়ী মাটিকাঁটার ডা. মাসুদ ও ক্যাশিয়ার অপর কয়লা ব্যবসায়ী শ্রীপুর ৩নং ওয়ার্ড বিএনপির সাবেক সভাপতি লাকমার জসীম উদ্দিন।

মঙ্গলবার বিকেলে তাহিরপুর উপজেলা সহকারি কমিশনার (ভুমি) মো. মুনতাসির হাসান বলেন, আমরা ট্যাকেরঘাটে সরকারি জমিতে দখলে থাকা শামীমসহ সব দখলদারকেই নোটিশ প্রেরণ করেছি,পরবর্তীতে মামলা দায়েরের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন থাকায় উচ্ছেদ অভিযান কিছুটা বিলম্বিত হচ্ছে।

মঙ্গলবার সন্ধায় সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল আহাদ বলেন,আমি এ বিষয়ে ইতিপুর্বেই তাহিরপুরের সহকারি কমিশনার(ভুমি)কে দিক নির্দেশনা দিয়েছি,সেখান থেকে কোন প্রতিবেদন এখনো পাওয়া যায়নি, প্রতিবেদন পেলে পরবর্তী আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে।

Please follow and like us:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Facebook
YouTube
YouTube
error: Content is protected !!