একজন কেরানীর মহানায়ক হবার গল্প

নিউজ ডেস্ক : ১৯৪৮ সালে উত্তম কুমারের প্রথম সিনেমা ‘দৃষ্টিদান’ মৃক্তি পায়৷ এর আগে ‘মায়াডোর’ নামে একটি সিনেমায় অভিনয় করলেও সেটি মুক্তি পায়নি৷ এরপর আরো ৪-৫টি মুভি করেছিলেন যার একটিও ব্যবসাসফল ছিল না৷ ‘ফ্লপ মাস্টার’ খেতাবও জুটেছিল তাঁর ভাগ্যে৷ ১৯৫৩ সালে ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ সিনেমায় উত্তম-সুচিত্রা জুটি তার ক্যারিয়ারে প্রথম সাফল্য যোগ করে৷ এরপর তো ইতিহাস৷ বাঙালির জীবনে এখনো তিনি ‘মহানায়ক উত্তম কুমার’৷

উত্তম কুমারের আসল নাম অরুন কুমার চ্যাটার্জি। তিনি ১৯২৬ সালের এই দিনে কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন। কলকাতার সাউথ সাবারবান স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাশ করেন। ভর্তি হন গোয়েঙ্কা কলেজে। মধ্যবিত্ত পরিবারের হাল ধরার জন্যে গ্র্যাজুয়েশন শেষ না করেই কলকাতা পোর্টে কেরানীর চাকরি শুরু করেন।

মঞ্চে কাজ করার সময়ই অভিনয়ের প্রেমে পড়েন। মায়াডোর নামের একটি চলচ্চিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পান কিন্তু শেষপর্যন্ত ছবিটি মুক্তি পায়নি। উত্তম কুমারের প্রথম মুক্তিপ্রাপ্ত ছবি দৃষ্টিদান। উত্তম কুমার সবার মনোযোগ আকর্ষণ করেন সাড়ে চুয়াত্তর ছবিতে অভিনয় করে। এই ছবিতে প্রথমবারের মতো তার সঙ্গে জুটিবদ্ধ হয়েছিলেন কিংবদন্তি অভিনেত্রী সুচিত্রা সেন। সেই থেকে ইতিহাস সৃষ্টি শুরু হলো। বাংলা চলচ্চিত্রে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও সফল জুটি উত্তম-সুচিত্রা। দুজনেরই বিয়ের পর চলচ্চিত্রে অভিষেক ঘটেছে।

হারানো সুর, সপ্তপদী, পথে হল দেরি, আনন্দ আশ্রম, নায়ক, চাওয়া পাওয়া, বিপাশা, সাগরিকা, খেলাঘর, ভ্রান্তিবিলাস, উত্তরায়ন একের পর এক ছবিতে দর্শকদের মনে ঠাঁই করে নেন উত্তম কুমার। ছোটি সি মুলাকাত, দেশপেমী, মেরা করম মেরা ধরম- নামের কয়েকটি হিন্দি ছবিতেও তিনি অভিনয় করেছেন। সবার আইডলে পরিণত হয়েছেন। হয়ে ওঠেছেন মহানায়ক। এ্যান্টনি ফিরিঙ্গি ও চিড়িয়াখানা ছবিতে অসামান্য অভিনয় দক্ষতার জন্য উত্তম কুমার এই দুই ছবিতে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন।

অভিনয়ে আসার আগেই পারিবারিক পছন্দে বিয়ে করেছিলেন গৌরি চট্টোপাধ্যায়কে। প্রেমিক পুরুষ হিসেবে সবার কাছে আকাঙ্ক্ষিত ছিলেন তিনি। তার সঙ্গে একাধিক নায়িকার প্রেমের সম্পর্ক ঘিরে গুঞ্জন উঠেছে। দ্বিতীয়বার বিয়ে করেন অভিনেত্রী সুপ্রিয়া দেবীকে। যদিও বিয়ের বৈধ কোনো দলিল নেই। সুপ্রিয়া দেবীও জানতেন উত্তম কুমারের বহু সম্পর্কে জড়িয়ে যাবার কথা। ভালোবাসতেন বলে মেনে নিয়েছিলেন অনেক কিছুই। স্ত্রী গৌরির ঘরে গৌতম চট্টোপাধ্যায় নামে এক সন্তান জন্মগ্রহণ করে। উত্তম কুমারের নাতী গৌরব টালিউড অভিনেতা।

উত্তম কুমার ছিলেন একজন ভার্সেটাইল অভিনেতা। সব ধরনের চরিত্রে নিজেকে উপস্তাপন করেছেন। বাঙালির মনের কোনে তিনি রোমান্টিক ইমেজ ধারণ করলেও প্রতিমুহূর্তে নিজেকে ভেঙে-চুরে নতুন করে আবিষ্কার করতে চেয়েছেন। নতুন কিছু জানার তৃষ্ণা তার মধ্যে ছিল প্রবল। ভালো করে ইংরেজি বলার আকাঙ্ক্ষার জন্য প্রতিষ্ঠিত অভিনেতা থাকাকালীই বাড়িতে শিক্ষক রেখে ইংরেজি শিখেছেন। আর পছনদ করতেন খেতে। স্ত্রী সুপ্রিয়া দেবীর হাতের নানা পদের মুখরোচক রান্না ছিল মহানায়কের ভীষণ প্রিয়।

দ্রুত মুটিয়ে যাচ্ছিলেন তিনি। স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দিয়েছিল। গুরুপাক সমস্ত খাবারের প্রতি একসময় ডাক্তার নিষেধাজ্ঞা জারি করলেন। কিন্তু উত্তম কুমার সেসব একদম গায়ে লাগাননি। ১৯৮০ সালের ২৪ জুলাই হার্ট অ্যাটাকে মৃত্যুবরণ করেন এই কিংবদন্তি অভিনেতা।

Please follow and like us:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Facebook
YouTube
YouTube
error: Content is protected !!