আমরা কি তাহলে এক ধর্ষক জাতিতে পরিণত হবার পথে ?

বিষাদগ্রস্ত মন, বিপর্যস্ত সামাজিক ব্যবস্থা, মানুষের জীবন শৃংখলহীন, অগ্নি গোলকের পৃথিবী। স্বাভাবিক জীবন প্রবাহ আবদ্ধ, মানুষ তার অধিকার করেছে নিমজ্জিত। একবিংশ শতাব্দী চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় যখন পৃথিবী তার গবেষণায় ব্যস্ত আমরা তখন দাঁড়িয়ে আছি নরকের দরজায়! জঘন্য অমানবিক পরিবেশে আমাদের বসবাস।

পত্রিকার পাতা উল্টালে, টেলিভিশনের দিকে তাকালে, কিবা সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে ভেসে উঠছে কি সব ভয়ঙ্কর জঘন্য সামাজিক অবক্ষয়। ধর্ষণের এই অবক্ষয়ের হাত থেকে সমাজকে রক্ষা করার কোন কার্যকরী ফর্মুলা আমাদের সামনে কি নেই? শিক্ষিত সমাজ অসহায় হয়ে পড়েছে, দেখা যাচ্ছে শিক্ষিতরা, বড় বড় পদধারীরা ধর্ষকের ভূমিকায়, শিশু, কিশোরী তরুণী, বৃদ্ধা কেউই ধর্ষণে থাবা থেকে বিপদ মুক্ত নয়! ধর্ষণের নিরাপদ জোনে পরিণত হয়েছে আমাদের সভ্য সমাজ।

Like and follow us on Facebook for all future news.

ভঙ্গুর এই সমাজ ব্যবস্থায় কি শিক্ষা নিয়ে আমরা সমাজের মানুষের সামনে দাঁড়াবো? কারণ শিক্ষক,নামধারী শিক্ষিতরা, মোড়ল-মাতব্বরেরা ধর্ষকের ভূমিকায়! দিন শুরু হয় ধর্ষণের খবর দিয়ে, কি ভয়াবহ চিত্র? শোনা যায় তিন থেকে পাঁচ বছরের শিশুকে ধর্ষণের পর গলা টিপে শ্বাসরোধ করে হত্যার পর পরিত্যক্ত ভবনে গলায় রশি দিয়ে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে, সেখানে মানব সৃষ্ট বর্বরতার নতুন সংজ্ঞা কি হতে পারে?

আজকে আমরা কেন এত নিচে নেমে গিয়েছি? ধর্ষকরা অবলীলায় মাথা উঁচু করে সমাজের মধ্যেই বসবাস করছে, তারা কি মনে করছে না তারা নিজেরাও ধর্ষিত হয়েছে! জাতি হিসেবে এই বিবেক কি হারিয়ে গিয়েছে? নাকি আমরা আত্মকেন্দ্রিক উপলব্ধি করছি!

Subscribe our YouTube channel for all our future videos.

জাতি হিসেবে আজ আমরা নরকের দরজায় দাঁড়িয়ে নিজেরাই নিজেদেরকে নরকে আলিঙ্গন জানাচ্ছি। আমাদের মানবিক গুণাবলী গুলোকে বিসর্জন দিয়ে দিয়েছি। ধর্ষণ,যৌন নির্যাতন, ইভটিজিং সহ নারীর প্রতি অসম্মান কে আমরা একটি স্বাভাবিক ঘটনা বলে চালিয়ে দিচ্ছি। জাতি হিসেবে এটা আমাদের জন্য কলঙ্কিত করছে।

একজন ধর্ষণকারী পুরুষ যখন কোন নারীকে ধর্ষণ করে তখন কি পুরুষ নিজেও ধর্ষিত হয় না? যদি তাই হয় তাহলে কেন ধর্ষণের মতো নির্লজ্জতা! দেশের মানুষ কেন আমরা ধর্ষকের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াচ্ছি না? সামাজিক সংগঠনগুলো কি লেজ গুটিয়ে ঘরে বসে থাকবে অথবা টকশোতে ধর্ষক বিরোধী একটি,দুটি কথা বললেই দায়িত্ব শেষ। সামাজিক আন্দোলনকারীরাও মনে হচ্ছে রাজনীতিকরণের মানদণ্ডে চিহ্নিত হচ্ছে!

বাংলাদেশ ধর্ষণের ভয়াবহতার চিএ তুলে ধরছি:

বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের তথ্যমতে, চলতি বছরের তিন মাসে ধর্ষণের শিকার হয়েছে ১৬৪ জন শিশু। এ সংখ্যা জানুয়ারিতে ছিল ৫২, ফেব্রুয়ারিতে বেড়ে হয় ৬০ এবং মার্চে ফের ৫২ জনে দাঁড়ায়। গত তিন মাসে গণধর্ষণের শিকার হয়েছে ১৯ জন। এর মধ্যে ৭ জন প্রতিবন্ধী শিশুও ধর্ষণের শিকার হয়। ধর্ষণচেষ্টা হয়েছে ৮ জনের ওপর। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ১২ জনকে। এ ছাড়া অপহরণের পর হত্যা করা হয়েছে ১১ জনকে।

২০১৮ সালে প্রতিদিন গড়ে ১৩ শিশু নির্যাতন, দুই শিশু ধর্ষণ এবং এক শিশু হত্যার শিকার হয়েছে। ২০১৭ সালের চেয়ে ২০১৮ সালে শিশু ধর্ষণ-গণধর্ষণ বেড়েছে অন্তত ৩৪%।

চাইল্ড পার্লামেন্টের জরিপে ২০১৮ সালে ৮৭ শতাংশ শিশুই কোনো না কোনো ভাবে যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে। গণপরিবহনেই নির্যাতনের শিকার হয়েছে ৫৩ শতাংশ। শিশুদের আত্মহত্যা করার প্রবণতা বেড়েছে ৩৯ দশমিক ৯১ শতাংশ। ২০১৮ সালে ২৯৮ শিশু আত্মহত্যা করে, ২০১৭ সালে এ সংখ্যাটি ছিল ২১৩।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সূত্র থেকে জানা গেছে, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত যৌন হেনস্তার শিকার হয়েছে ১৮ জন নারী। শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে ৫ জন। নির্যাতনের পর আত্মহত্যা করেছে ১ জন। নির্যাতনের পর হত্যা করা হয়েছে ১৪ জনকে। অ্যাসিডসন্ত্রাসের শিকার হয়েছে ৫ জন। এ ছাড়া বিভিন্নভাবে হত্যা করা হয়েছে ৬৯ জন শিশুকে।

বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১১ সালে সারা দেশে ৬২০ জন, ২০১২ সালে ৮৩৬ জন, ২০১৩ সালে ৭১৯ জন নারী ধর্ষণের শিকার হয়।

২০১৫ সালের প্রথম ছয় মাসে বাংলাদেশে শিশু ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ২৮০টি। ২০১৪ সালে এই সংখ্যা ছিল ১৯৯টি। আর ২০১৩ সালে ১৭০টি এবং ২০১২ সালে ছিল ৮৬টি।

২০০১ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে ধর্ষণ ও নির্যাতনের শিকার হয়ে চিকিৎসা সহায়তা নিতে আসে ২২ হাজার ৩৮৬ জন নারী।

শিশুদের নিয়ে কাজ করা বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে, ২০১৪ সালের জানুয়ারি মাস থেকে ২০১৮ সালের নভেম্বর মাস পর্যন্ত, অর্থাৎ গত পাঁচ বছরে সারা দেশে ২৩২২ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। আর ধর্ষণচেষ্টা ও যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে আরও ৬৩৯ জন শিশু।

এই চিত্রটি প্রমাণ করে ধর্ষণ সমাজের রন্ধে রন্ধে প্রবেশ করেছে। ডুবিয়ে দিচ্ছে আমাদের ইতিহাস-ঐতিহ্য ও নৈতিকতা, আমাদের ধর্ম, আমাদের স্বাধীনতা, আমাদের মানুষত্ববোধ, আমাদের শিক্ষা ও সামাজিক মূল্যবোধ সবকিছুই নিমজ্জিত করছে ধর্ষণের হিংস্র থাবা।
আজকের তরুণ সমাজ ও ছাত্র সমাজ রুখে দাঁড়ালে, সমগ্র জাতি রুখে দাঁড়াবে। সমগ্র মানুষ আজ তাকিয়ে আছে তরুণদের দিকে। তরুণেরাই কান্ডারীর ভূমিকা পালন করবে, তাহলেই রক্ত দিয়ে অর্জিত স্বাধীনতার মান রক্ষা পাবে।


লেখক : মোঃ সবুর মিয়া, বেসরকারি চাকরিজীবী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error

কোয়ালিটি নিউজ ও ভিডিও পেতে সাবস্ক্রাইব করুন।

http://www.britishbanglanews.com/150k
https://www.facebook.com/Britishbanglanews/121k
https://www.facebook.com/Britishbanglanews/
youtube.com/c/BritishBanglaNews18k
youtube.com/c/BritishBanglaNews
error: Content is protected !!