আজ ক্ষুদিরামের ১১১ তম ফাঁসি দিবস

নিউজ ডেস্ক : ক্ষুদিরাম বসু ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের কিংবদন্তী বিপ্লবীর নাম। ১৯০৮ সালের এই দিনে একটি হত্যা মামলায় এই মহান বিপ্লবীকে ফাঁসি কাষ্ঠে ঝুলিয়ে মৃত্যুদন্ড কার্যকর করেন ভারতবর্ষের তৎকালীন বৃটিশ সরকার।

তার নামটি শুনলেই চেতনার আয়নায় ভেসে উঠে একটি ফাঁসির দৃশ্য। সমস্ত শরীর-মন শিহরণে জেগে উঠে। এ এক অদ্ভুত ক্ষোভ আর গর্বের অনুভূতি। ১১ আগস্ট ১৯০৮ সালে ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের শুরুর দিকে সর্বকনিষ্ঠ বিপ্লবী নাম ক্ষুদিরাম বসুকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করা হয়। তখন ক্ষুদিরাম বসুর বয়স ছিল মাত্র ১৮ বছর ৭ মাস ১১ দিন। ক্ষুদিরাম বসু এই মহান বিপ্লবীকে আজ সশ্রদ্ধচিত্তে স্মরণ করছি।

ক্ষুদিরাম বসু:
ক্ষুদিরাম বসু ৩ ডিসেম্বর ১৮৮৯ সালে তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির মেদিনিপুর জেলার অন্তর্গত কেশপুর থানার অন্তর্গত মোহবনী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতার ত্রৈলোক্য নাথ বসু, মা লক্ষীপ্রিয় দেবী। তাঁর পিতা ছিলেন নাদাজল প্রদেশের শহরে আয় এজেন্ট। তিন কন্যার পর তিনি বাবা-মায়ের ৪র্থ সন্তান। দুই পুত্র আগেই মারা গেলে অপর পুত্রের মৃত্যুর আশঙ্কায় মা তাঁকে বড় বোনের কাছে ৩ মুষ্ঠি খুদের (শষ্যের খুদ) বিনিময়ে বিক্রি করে দেন। সেই থেকে খুদের বিনিময়ে ক্রয়কৃত শিশুটির নাম ‘ক্ষুদিরাম বসু’।

ছয় বছর বয়সে মা লক্ষ্মীপ্রিয়া দেবীর মৃত্যু এবং একই বছরে পিতা ত্রৈলোক্যনাথ বসু মারা গেলে জ্যেষ্ঠ বোন তাঁকে লালন পালন করেন। গ্রামের বিদ্যালয়ে প্রাথমিক শিক্ষার পর তমলুকের ‘হ্যামিল্টন’ স্কুল ও তারপর ১৯০৩ সালে মেদিনীপুরের ‘কলেজিয়েট’ স্কুলে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত তিনি শিক্ষা লাভ করেন। পড়াশুনায় মেধাবী হলেও কিশোরোচিত দুরন্তপনা ও দুঃসাহসিক কার্যকলাপের প্রতি তাঁর ঝোঁক ছিল।

১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ বিরোধী ও স্বদেশী আন্দোলন ক্ষুদিরামের মতো স্কুলের ছাত্রদেরও প্রভাবিত করে এবং পরিণামে তিনি পড়াশোনা ছেড়ে সত্যেন বসুর নেতৃত্বে এক গুপ্ত সমিতিতে যোগ দেন। আরও কয়েকজনের সঙ্গে সেখানে তিনি শরীরচর্চার সাথে সাথে নৈতিক ও রাজনৈতিক শিক্ষা পেতে শুরু করেন। এ সময়ে পিস্তল চালনাতেও তাঁর হাতেখড়ি হয়। বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের অংশ হিসেবে ইংল্যান্ডে উৎপাদিত কাপড় পোড়ানো ও ইংল্যান্ড থেকে আমদানিকৃত লবণে বোঝাই নৌকা ডোবানোর কাজে ক্ষুদিরাম অংশগ্রহণ করেন।

১৯০৬ সালের মার্চে মেদিনীপুরের এক কৃষি ও শিল্পমেলায় রাজদ্রোহমূলক ইস্তেহার বণ্টনকালে ক্ষুদিরাম প্রথম পুলিশের হাতে ধরা পড়লেও পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। পরবর্তী মাসে অনুরূপ এক দুঃসাহসী কর্মের জন্য তিনি পুলিশের হাতে ধরা পড়েন এবং আদালতে বিচারের সম্মুখীন হন। কিন্তু অল্প বয়সের বিবেচনায় তিনি মুক্তি পান। ১৯০৭ সালে হাটগাছায় ডাকের থলি লুট করা এবং ১৯০৭ সালের ৬ ডিসেম্বর নারায়ণগড় রেল স্টেশনের কাছে বঙ্গের ছোটলাটের বিশেষ রেলগাড়িতে বোমা আক্রমণের ঘটনার সাথে তিনি জড়িত ছিলেন। একই বছরে মেদিনীপুর শহরে অনুষ্ঠিত এক রাজনৈতিক সভায় সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মধ্যপন্থি রাজনীতির বিরুদ্ধে তিনি বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন।

বঙ্গভঙ্গ বিরোধী ও স্বদেশী আন্দোলনের কর্মীদের প্রয়োজনভিত্তিক কঠোর সাজা ও দমননীতির কারণে কলকাতার প্রধান প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেট কিংসফোর্ড বাঙালিদের অত্যন্ত ঘৃণার পাত্রে পরিণত হয়েছিলেন। যুগান্তর বিপ্লবীদল ১৯০৮ সালে তাঁকে হত্যার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে এবং প্রফুল্ল চাকী ও ক্ষুদিরামের উপর এ দায়িত্ব পড়ে।

কর্তৃপক্ষ কিংসফোর্ডকে কলকাতা থেকে দূরে মুজাফ্ফরপুরে সেশন জাজ হিসেবে বদলি করে দিয়েছিলেন। দুই যুবক ৩০ এপ্রিল স্থানীয় ইউরোপীয় ক্লাবের গেটের কাছে একটি গাছের আড়ালে অতর্কিত আক্রমণের জন্য ওত পেতে থাকেন। কিন্তু কিংসফোর্ডের গাড়ির মতো অন্য একটি গাড়িতে ভুলবশত বোমা মারলে গাড়ির ভেতরে একজন ইংরেজ মহিলা ও তাঁর মেয়ে মারা যান। এ ঘটনার পর ক্ষুদিরাম ওয়ানি রেলস্টেশনে পুলিশের হাতে ধরা পড়েন। তিনি বোমা নিক্ষেপের সমস্ত দায়িত্ব নিজের উপর নিয়ে নেন। কিন্তু অপর কোনো সহযোগীর পরিচয় দিতে বা কোনো গোপন তথ্য প্রকাশ করতে রাজি হননি।

তাঁকে মৃত্যুদন্ড প্রদান করা হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য অনুসারে মুজফ্ফরপুর কারাগারে ১৯০৮ সালের ১১ আগস্ট তাঁকেফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করা হয়।

Please follow and like us:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Facebook
YouTube
YouTube
error: Content is protected !!